অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে নির্যাতন, মেনে নিতে পারছে না শিশু সন্তানেরা
অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে নির্যাতন, মেনে নিতে পারছে না শিশু সন্তানেরা
মায়ের চিৎকার শুইনা ঘুম ভাঙে আমাগো দুই ভাইবোনের। উইঠা দেখি, মারে না পাইয়া ছোট ভাই কাউছার বিছানায় কানতাছে। বাইরে যাইয়া দেখি, মারে গাছের সাথে গরুর দড়ি দিয়া বাইন্ধা পিটাইতাছে। কাছে যাইয়া মারে জড়ায়ে ধরলে ধাক্কা দিয়া ফেলাইয়া দিছে। ভয়ে ঘরে আইসা মাটিতে বইসা চিৎকার করে কানছি। কানতে কানতে গলা ভাইংগ্যা গেছে।’ ময়মনসিংহের নান্দাইলের দক্ষিণ কয়রাটি গ্রামে ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ কল্পনা বেগমের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের বর্ণনা এভাবেই দিচ্ছিল তার সাত বছর বয়সী কন্যা সানজিদা আক্তার।
ঈদের পরদিন মঙ্গলবার (২৭ জুন) সকালে অটোরিকশাচালক সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী কল্পনা বেগমের ওপর নির্যাতনের ওই ঘটনা ঘটে। জমি বিরোধের জের ধরে তার ওপর নির্যাতন চালায় প্রতিপক্ষ আব্দুল আওয়ালের পরিবারের সদস্যরা। এ ঘটনায় ওই দিনই সিরাজুল বাদী হয়ে আওয়ালকে প্রধান আসামি করে আট জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ আওয়াল ও তার চাচাত ভাই কাশেমকে গ্রেফতার করেছে।
কল্পনার ওপর চালানো নির্যাতন নিজ চোখেই দেখেছে তার মেয়ে সানজিদা ও তিন বছর বয়সী ছেলে কাউছার। স্থানীয় স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত সানজিদা বলছে, ‘মাকে যে ওরা এত মেরেছে, দেখে খুব কষ্ট পাইছি। কাউছার তো খাওয়া-দাওয়া করতেছে না ঠিকমতো। শুধু মায়ের জন্য কানতাছে। ঘুমের ঘোরেও মা মা বলে কানতাছে।’
নির্যাতিত কল্পনার মেয়ে সানজিদা ও ছেলে কাউছারনির্যাতনে গুরুতর আহত হয়ে কল্পনা এখন কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মাকে নির্যাতনের ঘটনা দেখার পাশাপাশি মায়ের অনুপস্থিতিও দুই শিশুর মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কল্পনার শাশুড়ি আমেনা খাতুন বলেন, ‘ছোট ছেলে কাউছার মায়ের জন্য সারাক্ষণ কান্না করে। খাওয়া-দাওয়াও করতে চায় না। সানজিদাও চুপচাপ হয়ে গেছে। মায়ের ওপর নির্যাতন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না এই দুই বাচ্চা।’
ময়মনসিংহ কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ এস এম রুহুল কুদ্দুস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিশুদের সামনে মাকে নির্যাতনের দৃশ্য কোমল শিশুর মনে দাগ রেখে যাবে। এ ঘটনায় তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক অনেকদিন পর্যন্ত থেকে যেতে পারে।’
এদিকে, সিরাজুলের দায়ের করা মামলার বিবরণে জানা যায়, সিরাজুল ও তার প্রতিবেশি আওয়ালের পরিবারের মধ্যে ৫ শতাংশ জমি কেনাবেচা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। ঈদের পরদিন মঙ্গলবার ভোরে সিরাজুল অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আওয়ালের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ওই জমির দখল নিতে যায়। জমির পাশে থাকা সিরাজুলের একটি ঘর ভেঙে দেয় তারা। এসময় সিরাজুলের পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কল্পনা বেরিয়ে এলে তাকে একটি গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়।
কল্পনাদের বাড়িসকাল ৭টার দিকে এ ঘটনার কথা সিরাজুল জানতে পারলে নান্দাইল উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার হস্তক্ষেপে উদ্ধার করা হয় কল্পনাকে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল উপস্থিত হয়ে অভিযুক্ত আব্দুল আওয়াল ও কাশেমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। এই দুই আসামি এখন জামিনে আছেন।
সিরাজুলের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ালের পরিবারের নারী ও পুরুষ সদস্যরা একসঙ্গে মিলে মারধর করে কল্পনাকে। প্রতিবেশী শিপন আক্তার বলেন, ‘কল্পনার চিৎকার শুনেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। একজন নারী, বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীর ওপর এভাবে নির্যাতন চালানো যায়, সেটা ভাবাই যায় না।’ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান স্থানীয়রা। জেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এইচ এম খালেকুজ্জামানও এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
তবে নির্যাতনের ঘটনা অস্বীকার করে জামিনে থাকা আওয়াল বলেন, ‘২০১৫ সালে সিরাজুলের কাছ থেকে আমরা ওই ৫ শতাংশ জমি দেড় লাখ টাকায় কিনেছি। কিন্তু সিরাজুল ওই জমি দখল ছাড়ছে না। তাই আমরা ওইদিন জমির দখল নিতে গিয়েছিলাম।’ কল্পনাকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাকে সাজানো বলে দাবি করেন তিনি।
নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তদন্ত খলিলুর রহমান হাওলাদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২ আসামিকে আমরা আদালতে পাঠিয়েছি। বাকিদের গ্রেফতারে প্রচেষ্টাও চলছে।’

Comments
Post a Comment